দেশের ব্যাংকগুলোয় ২০২২ সালের জুন শেষে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সে হিসাবে এ সময়ের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, আড়াই বছরে বর্ধিত এ আমানতের ৮৭ শতাংশই ঋণ হিসেবে নিয়েছে সরকার। তবে সে অর্থ উৎপাদনশীল ও জনকল্যাণমূলক খাতে তেমন অবদান রাখতে পারেনি, বরং সরকারের ঋণের বোঝা আরো বাড়িয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সরকারের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল ত্রৈমাসিক ডেট বুলেটিন প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকায়। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ১১ লাখ ৭ হাজার ৫১৩ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। আর স্থানীয় ঋণের মধ্যে ব্যাংক থেকেই নিয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০২২ সালের জুন শেষে ব্যাংক থেকে নেয়া সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। সে হিসাবে আড়াই বছরের ব্যবধানে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ ২ লাখ ৭০ হাজার ৯৪ কোটি টাকা বেড়েছে।
বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া সরকারের ঋণের বড় অংশই আসে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। ট্রেজারি বিল-বন্ড তথা সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে এ ঋণ নেয়া হয়। বর্তমানে সরকারি বিলের মধ্যে রয়েছে ১৪, ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল। আর দুই, পাঁচ, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয় সরকার। অর্থ সংকটে পড়ে ২০১৯ সালে এসে সরকার বিশেষ উদ্দেশ্যে ট্রেজারি বন্ড (এসপিটিবি) নামে বন্ড ছেড়েও ঋণ নিতে শুরু করে। বিল-বন্ডের বাইরে সঞ্চয়পত্র, সঞ্চয় বন্ড ও প্রাইজ বন্ডের মাধ্যমে জনগণ থেকে সরাসরি ঋণ নেয় সরকার।
অর্থ বিভাগের তথ্যানুসারে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে স্থানীয় উৎস থেকে নেয়া সরকারি ঋণের ৬২ শতাংশই এসেছে ব্যাংকের কাছ থেকে। এ সময় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেয়া ঋণের মধ্যে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১ লাখ ৫২ হাজার ১৭০ কোটি এবং ট্রেজারি বন্ড ও এসপিটিবির মাধ্যমে ৫ লাখ ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। ২০২২ সালের জুন শেষেও ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৭৭ হাজার ২০ কোটি এবং ট্রেজারি বন্ড ও এসপিটিবির মাধ্যমে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ ছিল সরকারের। গত আড়াই বছরে ব্যাংক থেকে সরকারের নেয়া ঋণ যে পরিমাণ বেড়েছে তার মধ্যে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা বেড়েছে পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে। আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেড়েছে ৩৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।
দেশের পুঁজিবাজার উন্নত না হওয়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) এ নির্বাহী পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আদর্শ পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে স্বল্পমেয়াদি কিংবা চলতি মূলধন ঋণ আসার কথা। কিন্তু আমাদের এখানে পুঁজিবাজার উন্নত না হওয়ার কারণে সেখান থেকে খুব বেশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন আসছে না। পাশাপাশি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে বেসরকারি খাত ও সরকার উভয়ই ঋণের জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’
সরকার প্রচুর ঋণ নেয়ায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে চাহিদামতো ঋণ পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে ড. মুস্তফা কে মুজেরী আরো বলেন, ‘বর্তমানে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে, নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। উৎপাদনও তেমন বাড়ছে না। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা কম। অর্থনীতিতে স্থবির অবস্থা চলছে, এটি সেটিরই প্রতিফলন। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করছে। এতে একদিকে উচ্চ রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিও নেই। কিন্তু ব্যাংকগুলোকে তো সরকারকে ঋণ দেয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। বরং বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে অর্থনীতি গতিশীল করাই ব্যাংকের দায়িত্ব।’
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৭ বছরে বাংলাদেশ সরকারের ঋণ ছিল ৮ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮-পরবর্তী মাত্র পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ কোটি টাকার নতুন ঋণ নিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। আর উচ্চসুদে নেয়া এ ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়েই এখন সরকারের পরিচালন ব্যয়ের অর্ধেক চলে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে যান দেড় দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী পদ আঁকড়ে রাখা শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় দেশের ঘাড়ে তিনি প্রায় ২০ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা চাপিয়ে গেছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেড় দশক আগে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা দায়িত্ব নেয়ার সময় তথা ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ছিল মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশী উৎস থেকে নেয়া হয়েছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ২০ কোটি টাকার ঋণ। বাকি ১ লাখ ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা নেয়া হয় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে।
শেখ হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ঋণের সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের কথা বলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ও শ্বেতহস্তীর প্রকল্প শেখ হাসিনা নিয়েছিলেন। প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছিল দেশী-বিদেশী ঋণের টাকায়। ওই সময় সমালোচনা করায় তিনি আমাকে “অর্বাচীন” বলে কটাক্ষ করেছিলেন। কিন্তু এখন প্রমাণ হচ্ছে, আমার বক্তব্য সঠিক ছিল। উন্নয়নের নামে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ঋণের সাগরে নিমজ্জিত করে গেছেন। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে বাংলাদেশের অন্তত এক দশক সময় লাগবে।’
স্থানীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়ার কারণে ট্রেজারি বিলের সুদহারও ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দুই ও পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ১১ শতাংশের নিচে। এক বছরের ব্যবধানে এ দুটি ট্র্রেজারি বিলের সুদহার ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার এ সময়ে ১১ থেকে বেড়ে প্রায় ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ট্রেজারি বিলের সুদহার বাড়ার প্রভাবে সরকারের সুদ বাবদ ব্যয়ও ক্রমেই বাড়ছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) স্থানীয় ঋণের বিপরীতে ৪৯ হাজার ৪৯২ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করেছে সরকার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছিল ৪৬ হাজার ৩০ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) স্থানীয় ঋণের বিপরীতে ৮১ হাজার ৫৩১ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার।
ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়নের প্রবণতা অতীতের মতো বর্তমানেও চলমান রয়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। যদিও সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ কমিয়ে ৯৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংক থেকে সরকার নিয়েছে ৮৫ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার ঋণ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক থেকে সরকারের নেয়া এ ঋণ যদি উৎপাদনশীল ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যবহার করা হতো তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু সরকারি সেবার মান বলেন কিংবা সরকারি সেবার আওতা বলেন আবার সরকারি বিনিয়োগের উৎকর্ষ বলেন—কোনো ক্ষেত্রেই তো এর খুব বেশি প্রতিফলন দেখা যায় না। বরং ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে। একদিকে ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে এবং এজন্য সুদহারও বেড়েছে। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয় কমে গেছে। তাহলে এ ঋণ নিয়ে সরকার কোথায় ব্যয় করেছে সে প্রশ্ন তো থেকেই যায়।’
আগামী অর্থবছরের বাজেটেও ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার প্রাক্কলন করেছে সরকার, যদিও তা চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় কিছুটা কম। প্রস্তাবিত আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সামনে যদি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসে সেক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের চাহিদা বাড়বে। আর বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ কম নিতে হবে। এজন্য হয় বাজেট ঘাটতি কমাতে হবে, নয়তো বিদেশী ঋণ বাড়াতে হবে কিংবা সরকারের ব্যয় কমাতে হবে। তাছাড়া সরকারের ঋণ চাহিদার কারণে যাতে বেসরকারি খাতের ঘুরে দাঁড়ানো বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য একটি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা তো দেখছি না।’